শুক্রবার, সেপ্টেম্বর-০৪, ২০২৬
সিলেটের আলোচিত সাদাপাথর লুট ও অবৈধ পাথর উত্তোলনকাণ্ডের পর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে পরিবর্তন এনে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আলোচিত প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলমকে। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১০ মাসের মাথায় হঠাৎ করেই তাকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। আর এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে প্রশাসনিক মহল থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যন্ত তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা।
রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উন-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ‘জনস্বার্থে’ সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদ থেকে মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে সারওয়ার আলম জানান, সোমবারের মধ্যে তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে বলা হয়েছে। তবে একই প্রজ্ঞাপনে তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নতুন জেলা প্রশাসকের নাম ঘোষণা না হওয়ায় প্রশাসনিক মহলে এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশে এমন তাৎক্ষণিক প্রত্যাহারকে অনেকেই অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন।
জানা যায়, ২০২৫ সালের আগস্টে সিলেটের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর এলাকায় পাথর লুটের ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দেয়। ওই ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর তৎকালীন জেলা প্রশাসককে সরিয়ে ২১ আগস্ট দায়িত্ব দেওয়া হয় সারওয়ার আলমকে। তবে যে সাদাপাথরকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তাকে সিলেটে আনা হয়েছিল, সেই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন তার পুরো দায়িত্বকালেও প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কিছু পদক্ষেপের কারণে আলোচনায় আসেন সারওয়ার আলম। নগরের ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ, ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে দালালমুক্ত করার উদ্যোগ প্রশংসা কুড়ায়। তবে অন্যদিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ভূমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, ভূমিকম্পঝুঁকিতে থাকা ভবন অপসারণে অগ্রগতির অভাবসহ বিভিন্ন ইস্যুতে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয় তাকে।
সবশেষ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারের দান ব্যবস্থাপনা নিয়ে জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপ। গত ১২ জুন মাজার পরিদর্শনে গিয়ে সারওয়ার আলম দানবাক্সে তালা লাগানোর নির্দেশ দেন। পরে ১৮ জুন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয় এবং দীর্ঘদিন ব্যবহৃত তিনটি ঐতিহাসিক ডেগ সিলগালা করা হয়। নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন করা হয় আনসার সদস্য এবং পরে নজরদারির জন্য সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কাজও শুরু হয়।
জেলা প্রশাসনের এই পদক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন মাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পুরোনো ডেগ সিলগালার প্রতিবাদে দরগাহ প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ হয়। ভক্তরা ‘লালে লাল, বাবা শাহজালাল’ স্লোগান দিয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন।
মাজারের খাদিম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না অভিযোগ করেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে মাজারবিরোধী যেসব গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে, তাদের প্রভাবেই শাহজালাল (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতার নামে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছে। তার দাবি, এটি মূলত মাজার ও অলি-আউলিয়াবিরোধী কর্মকাণ্ড। তিনি বলেন, দানের অর্থ শুধু খাদেমদের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত হয় না; মাজার, মসজিদ ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোর উন্নয়নেও তা ব্যয় করা হয়। হিসাব-নিকাশ চাওয়া যেতে পারে, তবে জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যদিকে সারওয়ার আলম দাবি করেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে মাজারের দানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি চালু ছিল। তার মতে, মাজারে আগত মানুষের দান জনসম্পদ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত এবং সেই অর্থের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই প্রশাসন এই উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি আরও বলেছিলেন, দানের কোনো অর্থ সরকার গ্রহণ করবে না; বরং অনিয়ম দূর করে সেই অর্থ মাজার, মসজিদ ও মাদ্রাসার উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। এ উদ্দেশ্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক করে খাদেম, মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিনিধিদের নিয়ে ১০ সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়। পাশাপাশি সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
মাজারকেন্দ্রিক এই বিতর্কের মধ্যেই রোববার দেশ-বিদেশে অবস্থানরত সিলেটের ৬৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক যৌথ বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
উল্লেখ্য, ২৭তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. সারওয়ার আলম একসময় র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ভেজালবিরোধী শতাধিক অভিযানে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দেশজুড়ে প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। পরে ২০২০ সালে তাকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। গত বছর তিনি উপসচিব পদে পদোন্নতি পান এবং ২০২৫ সালের আগস্টে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তবে প্রশ্ন এখন একটাই— সাদাপাথরকাণ্ডের জেরে সিলেটে আসা সারওয়ার আলম কি শেষ পর্যন্ত মাজারকেন্দ্রিক বিতর্কের কারণেই প্রত্যাহার হলেন, নাকি এর পেছনে রয়েছে আরও গভীর কোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক বাস্তবতা?
সিলেটের সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ এখন সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে।