বাবার জানাজায় অনুপস্থিত মোজতবা, নতুন করে প্রশ্নের মুখে ইরানের নেতৃত্ব

  বিশেষ প্রতিনিধি । দেশ পত্রিকা     06-07-2026    187
বাবার জানাজায় অনুপস্থিত মোজতবা, নতুন করে প্রশ্নের মুখে ইরানের নেতৃত্ব

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রথম জানাজা রোববার (৫ জুলাই) রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে জানাজায় দেশটির শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের উপস্থিতি থাকলেও খামেনির ছেলে এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিকে দেখা যায়নি। তার এই অনুপস্থিতি ঘিরে দেশ-বিদেশে নতুন করে নানা জল্পনা-কল্পনার সৃষ্টি হয়েছে।

জানাজায় খামেনির অন্য তিন ছেলে—মাসউদ, মোস্তফা ও মেইসাম উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধান আহমদ ভাহিদিসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সামরিক নেতারাও অংশ নেন। কিন্তু মোজতবা খামেনির অনুপস্থিতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ইরানি বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বাবার জানাজায় উপস্থিত না থাকায় মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, যে বিমান হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন, সেই হামলায় মোজতবাও আহত হয়ে থাকতে পারেন। চলতি বছরের মার্চে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

১৯৮৯ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তার আনুষ্ঠানিক শেষ বিদায় অনুষ্ঠান গত শুক্রবার (৩ জুলাই) শুরু হয়েছে, যা এক সপ্তাহব্যাপী চলবে। ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে ধারাবাহিকভাবে শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব শোকানুষ্ঠানে এক কোটি ২০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের অংশগ্রহণ হতে পারে। তারা এই বিদায়কে ‘শতাব্দীর শেষ বিদায়’ হিসেবে উল্লেখ করছে। বর্তমানে তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে খামেনির মরদেহ রাখা হয়েছে। সেখানে ৯৭ বছর বয়সী শিয়া আলেম জাফর সোবহানির ইমামতিতে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

রোববার ইরানজুড়ে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। এদিন তেহরানে শোকানুষ্ঠানে বিপুল জনসমাগম ঘটে। সোমবারের শোভাযাত্রার আগে মরদেহ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়। পুরো আয়োজনকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে, জানাজা ও শোকানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অনেকের কণ্ঠে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলবিরোধী স্লোগান শোনা যায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শিত প্ল্যাকার্ড ও ব্যানারে প্রতিশোধের আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরাপত্তা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, গ্র্যান্ড মোসাল্লা ও আশপাশের চিকিৎসাকেন্দ্রে চার হাজারের বেশি মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। অতিরিক্ত ভিড় ও তীব্র গরমের কারণে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়লেও এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।

খামেনির কফিনের পাশে তেহরানে হামলায় নিহত তার পরিবারের আরও চার সদস্যের কফিন রাখা হয়েছে। তাদের মধ্যে এক বছর বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদি গোলপায়েগানিও রয়েছেন।

সোমবার তেহরানে শোভাযাত্রা শেষে মরদেহ কোম শহরে নেওয়া হবে। এরপর ইরাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিয়া ধর্মীয় স্থানে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সবশেষে বৃহস্পতিবার তার নিজ শহর মাশহাদে দাফন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

অন্যদিকে, চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে নাজুক যুদ্ধবিরতি বহাল থাকলেও স্থায়ী শান্তি নিয়ে আলোচনা এখনো অনিশ্চয়তায় রয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বরাতে শোকানুষ্ঠান চলাকালে শান্তি আলোচনা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিসহ বিভিন্ন সূত্রের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সমীকরণের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক-এর আরও খবর