শুক্রবার, সেপ্টেম্বর-০৪, ২০২৬
চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সাড়ে ৭ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী ক্রয়ের টেন্ডারকে ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, পছন্দের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় নানা কৌশল, যোগসাজশ এবং বিধিবহির্ভূত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমনকি সব পণ্য সরবরাহের আগেই সরকারি বিল পরিশোধের অভিযোগও সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চলতি অর্থবছরে ১৪টি পৃথক আইটেমে দরপত্র আহ্বান করে। সব প্রক্রিয়া শেষে মোট ৯ কোটি ২১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৬৬ টাকার চুক্তি সম্পাদিত হয়। এর মধ্যে ‘এমএসএম হেলথ কেয়ার’ ও ‘এমএসএম বাংলাদেশ’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান একাই পায় ৭ কোটি ৫৯ লাখ ৮৬ হাজার ৯৩৬ টাকার ছয়টি কার্যাদেশ। প্রতিষ্ঠান দুটির মালিক রুমানা সুলতানা মৌ নামে একই ব্যক্তি বলে জানা গেছে।
অভিযোগ উঠেছে, এই দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে নানা অনিয়ম করা হয়েছে। কয়েকজন ঠিকাদার পৃথকভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগও জমা দিয়েছেন।
অভিযোগকারী ঠিকাদারদের দাবি, টেন্ডারে যে ধরনের পূর্ব অভিজ্ঞতার শর্ত ছিল, এমএসএম হেলথ কেয়ার ও এমএসএম বাংলাদেশের সেই অভিজ্ঞতা নেই। এর আগে বড় অঙ্কের সরকারি কাজ করার রেকর্ডও তাদের নেই। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট একটি পক্ষকে সুবিধা দিতে নতুন নতুন শর্ত আরোপ করে অন্য অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অযোগ্য বা ‘নন-রেসপনসিভ’ ঘোষণা করা হয়েছে।
অভিযোগে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একরাম হোসাইন, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. নাছির উদ্দিন খালেদ এবং স্টোরকিপার শহীদুল আলমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি একজন ড্যাব নেতা এবং একটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও তোলা হয়েছে।
নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি সরবরাহের একটি টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা থাকা সত্ত্বেও একটি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ না দিয়ে প্রায় ১৮ লাখ টাকা বেশি মূল্যে এমএসএম হেলথ কেয়ারকে কাজ দেওয়া হয়েছে। একই প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এক টেন্ডারে ‘নন-রেসপনসিভ’ ঘোষণা করা হলেও অন্য টেন্ডারে আবার ‘রেসপনসিভ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যা পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পণ্য সরবরাহের আগেই সরকারি বিল পরিশোধ নিয়ে। গত ২২ জুন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের সব মালামাল বুঝে পাওয়ার প্রত্যয়ন দিয়ে বিল অনুমোদনের জন্য জমা দেয় এবং একই দিনে বিল অনুমোদিত হয়। অথচ পরদিন ২৩ জুন সরেজমিনে দেখা যায়, ওই বিলের অন্তর্ভুক্ত ওষুধ তখনও হাসপাতালে সরবরাহ করা হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে এমএসএম হেলথ কেয়ার ও এমএসএম বাংলাদেশের কর্ণধার রুমানা সুলতানা মৌ সব ধরনের অনিয়ম অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, নির্ধারিত প্রক্রিয়াতেই কাজ হয়েছে এবং প্রায় সব পণ্য আগেই সরবরাহ করা হয়েছে। কেবল একটি ভ্যাকসিন পরে সরবরাহ করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একরাম হোসেনও অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি সবসময় স্বচ্ছতায় বিশ্বাস করেন। তার দাবি, টেন্ডার মূল্যায়নের জন্য আলাদা কমিটি রয়েছে এবং সেই কমিটির সুপারিশ ছাড়া কাউকে কার্যাদেশ দেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগ ওঠার পর পুরো বিষয়টি তদন্তে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে একটি নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে সমালোচকরা বলছেন, আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালের কেনাকাটা নিয়ে অতীতেও একাধিক দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের নেতারা বলছেন, বারবার একই ধরনের অভিযোগ ওঠা প্রমাণ করে স্বাস্থ্যখাতের কেনাকাটায় দুর্নীতির সংস্কৃতি এখনও বন্ধ হয়নি।
এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকও জানিয়েছেন, অভিযোগটি ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত সেখান থেকেই নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন নজর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।