শুক্রবার, সেপ্টেম্বর-০৪, ২০২৬
রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ এলাকায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত একটি বিক্ষোভ মিছিল শেষে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ‘দৈনিক সকাল’ পত্রিকার সাংবাদিক মাহফুজুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারীরা তাকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্য রাস্তায় ফেলে মারধর করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মঙ্গলবার সকালে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের ধানমন্ডি জোনের উদ্যোগে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আয়োজিত বিক্ষোভ কর্মসূচির শেষ পর্যায়ে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে একদল ব্যক্তি ওই সাংবাদিকের ওপর চড়াও হয়।
হামলার ঘটনায় সাংবাদিক মাহফুজুর রহমানের পরনের পোশাক ছিঁড়ে যায় এবং নাক ও ঠোঁটে গুরুতর আঘাত লাগে। পরে তিনি অভিযোগ করেন, কর্মসূচি চলাকালে কয়েকজন ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে তাকে ‘লীগ’ আখ্যা দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে এবং কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধর শুরু করে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ‘দ্য নিউজ’-এর মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার মারুফ জানান, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অনুষ্ঠিত ফ্যাসিবাদবিরোধী ওই বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর কয়েকজন নেতাকর্মী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় এক বক্তা সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “যারা ভিডিও করবেন না, তারা চলে যান।”
বক্তার এমন মন্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে মাহফুজুর রহমান বলেন, “আমরা তো আপনাদের কর্মী নই যে আপনারা যা বলবেন তাই করব।” প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, এই বক্তব্যের পরপরই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং হামলার সূত্রপাত ঘটে।
মারুফের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবাদের পর কয়েকজন ব্যক্তি মাহফুজুর রহমানকে ‘লীগ’ আখ্যা দিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেন এবং তাকে জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। উপস্থিত অন্য সাংবাদিকরা দ্রুত তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তার টি-শার্টের একটি বড় অংশ ছিঁড়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, টি-শার্ট ছিঁড়ে যাওয়ার পর মাহফুজুর রহমান পুনরায় ঘটনার প্রতিবাদ করলে হামলাকারীরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাকে প্রকাশ্য সড়কে ফেলে বেধড়ক মারধর করা হয়। এ সময় তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যাওয়া অন্য সাংবাদিকরাও ধাক্কাধাক্কি ও হেনস্তার শিকার হন।
মারুফ দাবি করেন, মাহফুজুর রহমানকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনিও লাথির আঘাতে রাস্তায় পড়ে যান। ঘটনাটি সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
উপস্থিত একাধিক গণমাধ্যমকর্মী অভিযোগ করেন, শুধুমাত্র ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ করার কারণে সাংবাদিক মাহফুজুর রহমানকে লক্ষ্য করে দুই দফায় পরিকল্পিতভাবে ‘মব’ তৈরি করা হয়। প্রকাশ্যে একজন সংবাদকর্মীর ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে একপর্যায়ে উপস্থিত সাংবাদিকরা কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ বর্জন করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
ঘটনার বিষয়ে ধানমন্ডি থানা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মুজিবুর রহমান খান ঘটনাটিকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বহিরাগত কেউ ঢুকে পড়ে এমন অনভিপ্রেত পরিস্থিতি তৈরি করে থাকতে পারে।”
তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের একাংশ এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তাদের অভিযোগ, হামলাকারীদের আড়াল করা এবং দায় এড়ানোর উদ্দেশ্যেই এখন ঘটনাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও স্থিরচিত্র বিশ্লেষণে হামলায় অংশ নেওয়া অন্তত তিনজনকে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা গেছে। এর মধ্যে একজন সাদা পাঞ্জাবি ও টুপি পরিহিত ছিলেন, দ্বিতীয়জন হালকা ধূসর টি-শার্ট পরা মধ্যবয়সী ব্যক্তি এবং তৃতীয়জন নীল জার্সি পরিহিত এক যুবক, যার জার্সির পেছনে ‘সোহান’ নাম লেখা ছিল বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ধানমন্ডি থানা-এর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে কোনো সাংবাদিকের ওপর হামলার বিষয়ে তার কাছে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য নেই।
তিনি আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে— এমন আশঙ্কায় ধানমন্ডি এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের ওপর এই হামলার ঘটনায় গণমাধ্যম অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।